জগ্গি বলল,
“দেখ, আমার কাছে মৃত্যু মানে একটা লম্বা ঘুম। স্বপ্নহীন। কোনো চিন্তা নেই, কোনো আফসোস নেই। শরীর ক্লান্ত হয়ে থেমে গেল—ব্যস, সব শেষ। একরকম শান্তি।”
রয় একটু হেসে বলল,
“তুই একেবারে সুইচ অফ করে দিলি সবকিছু! আমি কিন্তু তা ভাবি না। আমার মনে হয় কিছু একটা থেকে যায়। হয়তো অন্য কোনো পথে চলা শুরু হয়। আত্মা বলে যদি কিছু থাকে, তবে সে কি এভাবে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে?”
জগ্গি হেসে উঠল।
“থাকতেই পারে। কিন্তু কোনো প্রমাণ আছে? কেউ তো ফিরে এসে বলে না—ওই দেখ, আমি আছি। আমাদের যারা চলে গেছে—বাবা, মা, বন্ধু—কেউ কোনো খবর পাঠায় না। শুধু মাঝে মাঝে কিছু স্মৃতি হঠাৎ এসে ধাক্কা মারে। একটা গান, একটা গন্ধ, কোনো পুরোনো রাস্তা। ওইটুকুই। তার বাইরে সব চুপ।”
তাদের ক্যাডি রহমান চুপচাপ শুনছিল। হঠাৎ বলল,
“সাহেব, যদি সত্যি জানতে চান, টালিগঞ্জে এক পীরবাবা আছেন। উনি নাকি ওদিকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। আমাদের বস্তিতে সবাই যায়। বড়লোকরাও যায়, শুধু বলে না।”
পরদিন সকালেই কৌতূহলটা জিতে গেল। তিনজনে গাড়ি করে টালিগঞ্জের ভেতরের গলিতে ঢুকল। ছোট্ট একটা বাড়ি, বাইরে লাইন—সব রকম মানুষ। ভিতরে ধূপের গন্ধ, নীরবতা।
পীরবাবা সাদা পোশাকে বসে আছেন। চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত।
তারা কিছু বলার আগেই তিনি হেসে বললেন,
“তোমরা জানতে চাও—মরার পর কী হয়। কেউ বলে জান্নাত, কেউ বলে অন্ধকার, কেউ বলে কিছুই নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা—তোমরা একটা চিহ্ন খুঁজছ, তাই না? যারা চলে গেছে, তারা ভালো আছে কিনা।”
জগ্গি বলল,
“আমার তো মনে হয় সব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এই যে হঠাৎ হঠাৎ স্মৃতি আসে—এগুলো কি শুধু মাথার খেলা?”
রয় বলল,
“আর যারা বলে আত্মার সঙ্গে কথা বলে—ওগুলো কি সত্যি, না সব অভিনয়?”
পীরবাবা একটু চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন,
“শরীরটা একটা ভাড়া বাড়ি। আত্মা সেই বাড়ির ভাড়াটে। সময় শেষ হলে সে বেরিয়ে যায়। ঘুমটা শরীরের, আত্মার নয়। সে অন্য কোথাও যায়—যেখানে সময়ের হিসেব আলাদা।
জান্নাত কোনো জায়গা নয়, একটা অনুভূতি—শান্তি।
আর যারা বলে আত্মা ফিরে আসে—তারা ভূতের মতো নয়। তারা আসে খুব সূক্ষ্মভাবে। একটা গন্ধ, একটা স্বপ্ন, একটা হঠাৎ বাঁচার বোধ—এইভাবে।”
তিনি একটু হেসে বললেন,
“প্রমাণ চাইলে পাবে না। এটা কোর্টে দেখানোর জিনিস নয়। এটা অনুভবের বিষয়। ভালোবাসা তার নিজের ভাষায় কথা বলে।”
রয় জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে এত নীরবতা কেন? কেউ স্পষ্ট করে কিছু জানায় না কেন?”
পীরবাবা বললেন,
“কারণ সব উত্তর পেলে জীবনটাই মাটি হয়ে যাবে। জন্মের সময়ই একটা বার্তা দিয়ে দেওয়া হয়েছে—বাঁচো, ভালোবাসো, মনে রাখো। বাকিটা রহস্য থাকাই ভালো।”
ফিরে আসার সময় গাড়িতে চুপচাপ বসে ছিল সবাই। হঠাৎ রয় বলল,
“কয়েকদিন আগে বাড়িতে ভাত, মুসুর ডাল আর আলুভাজা খাচ্ছিলাম। একেবারে সোজা খাবার—কিন্তু কী যে হল! হঠাৎ মনে হল আমি আবার ছোট হয়ে গেছি। মাটিতে বসে খাচ্ছি, সামনে ধোঁয়া ওঠা ডালের গন্ধ, পাশে কড়া করে ভাজা আলু… আর মা বসে আছে সামনে, চুপচাপ হাসছে। সেই চেনা দৃষ্টি—যেন আমি খাচ্ছি সেটাই তার সবচেয়ে বড় আনন্দ।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য সব সত্যি হয়ে গেল। যেন মা কোথাও যায়নি।”
জগ্গি আস্তে বলল,
“এই তো সেই সিগন্যাল।”
রয় মাথা নাড়ল।
“হয়তো। বড় কিছু না—কিন্তু খুব কাছের।”
রহমান হেসে বলল,
“বাবা বলেন, মরা মানুষরা সাধারণ জিনিসের মধ্যেই কথা বলে।”
তারপর আর কেউ তেমন কথা বলল না।
শেষ পর্যন্ত তারা কোনো প্রমাণ পেল না—না মৃত্যুর পরে কিছু আছে, না নেই। কিন্তু একটা জিনিস বুঝল—স্মৃতিগুলো শুধু স্মৃতি নয়। সেগুলো যেন অদৃশ্য সুতো, যা আমাদের ধরে রাখে।
মৃত্যু হয়তো শেষ নয়। আবার নিশ্চিত শুরুও নয়।
কিন্তু ভালোবাসা—সেটা কোথাও যায় না।
হয়তো সেই কারণেই, এক প্লেট ভাত, মুসুর ডাল আর আলুভাজা হঠাৎ মাকে ফিরিয়ে আনতে পারে—নিঃশব্দে, খুব কাছে।

4 comments:
Darun explanation. Etai chiro sattyi
Darun likhechen
Thanks Amaresh !
Thanks HPC for liking the blog !
Post a Comment