কেউ সাফল্য মাপে টাকায়, কেউ মাপে মানুষের হাসিতে।
রবিবারের দুপুরগুলো সাধারণত একটু শান্ত হয়।
শহরের কোলাহল যেন কিছুটা থেমে থাকে, আর মানুষের মনও তখন নিজের ভেতরের দিকে তাকানোর সময় পায়।
শুভেন্দু সেদিনও বারান্দায় বসে ছিল। অবসর নেওয়ার পর তার জীবনটা অনেকটাই সরল হয়ে গেছে। সংসার চালানোর মতো যথেষ্ট টাকা আছে, আর খুব বেশি চাহিদাও নেই। তাই বহুদিন ধরেই সে একটা অভ্যাস তৈরি করেছে—প্রতি মাসে কিছু টাকা আলাদা করে রাখে, যাদের সত্যিই প্রয়োজন তাদের সাহায্য করার জন্য।
তার বন্ধু কমল চক্রবর্তী যখন পুরুলিয়ার অনুর্বর জমিতে গাছ লাগিয়ে গড়ে তুলছিল, তখন থেকেই শুভেন্দু তাকে সাহায্য করত। কর্পোরেট সংস্থাগুলোর কাছে গিয়ে, পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে, কখনও নিজের পকেট থেকেও—যেভাবে পারত সাহায্য করত।
কমলের হঠাৎ মৃত্যুর পর অনেকেই ভেবেছিল এই উদ্যোগ হয়তো থেমে যাবে।
কিন্তু তা হয়নি।
সেই দায়িত্ব তুলে নিয়েছে Joyoti।
Joyoti শহরের মেয়ে। চাইলে সে অন্যরকম জীবন বেছে নিতে পারত। কিন্তু সে থেকে গেছে পুরুলিয়ার মাটিতে, সাঁওতাল গ্রামগুলোর মাঝখানে। Bhalopahar-এ একটি ছোট্ট প্রাথমিক স্কুল চলছে—গরিব সাঁওতাল শিশুদের জন্য। সেই স্কুলটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য Joyoti যেন নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করেছে।
সে বিয়ে করেনি।
নিজের জন্য আলাদা কোনও ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও করেনি।
সকালবেলা স্কুল, বাচ্চাদের পড়ানো, তাদের দেখাশোনা—কখনও অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা—সবকিছুতেই Joyoti নিজে জড়িয়ে থাকে।
শুভেন্দু যখনই Bhalopahar-এ যায়, তার মনে হয় এই মেয়েটার ভিতরে এক অদ্ভুত শক্তি আছে—নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর।
শহরের এত শিক্ষিত মানুষদের মাঝেও এমন নিবেদন খুব কমই দেখা যায়।
সেই রবিবার দুপুরেই ফোনটা এল।
ওপাশে তার ভাইঝি। খুব আনন্দের সঙ্গে জানাল—সে মুম্বাই চলে যাচ্ছে। নতুন চাকরি, নতুন জীবন। আর একটি নতুন ফ্ল্যাট—দাম কয়েক কোটি টাকা।
শুভেন্দু তাকে অভিনন্দন জানাল।
ফোন কেটে গেল।
তারপর কিছুক্ষণ সে চুপ করে বসে রইল।
মনের ভেতর যেন দুটো ছবি পাশাপাশি ভেসে উঠল।
একদিকে Joyoti—
পুরুলিয়ার শুকনো মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়ে, যে নিজের জীবনটা উৎসর্গ করেছে গরিব সাঁওতাল বাচ্চাদের জন্য।
আর অন্যদিকে তার ভাইঝি—
মেধাবী, পরিশ্রমী, সফল এক আধুনিক পেশাদার নারী, যে নিজের যোগ্যতায় মুম্বাই শহরে কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনছে।
দুটো ছবিই সত্যি।
দুটো পথই আলাদা।
একটায় আছে আত্মত্যাগের শান্ত আলো।
অন্যটায় আছে সাফল্যের উজ্জ্বল দীপ্তি।
হঠাৎই শুভেন্দুর মনে প্রশ্নটা এসে দাঁড়াল।
আজ তো আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
তাহলে সত্যিকারের সফল নারী কে?
মুম্বাইয়ের আকাশছোঁয়া ফ্ল্যাটে থাকা সেই পেশাদার মেয়ে?
নাকি পুরুলিয়ার Bhalopahar-এর মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা Joyoti, যে নিজের জীবনটাকে অন্যের জন্য বিলিয়ে দিয়েছে?
উত্তরটা সহজ নয়।
সম্ভবত জীবনের মতোই—
উত্তরটাও প্রত্যেকের নিজের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে।

No comments:
Post a Comment